তেরশ্রী জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের তেরশ্রী গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই জমিদার বাড়িটি কেবল প্রাচীন স্থাপত্যের জন্যই নয়, বরং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নির্মম ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্মারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ|

ইতিহাস ও গোড়াপত্তন
ব্রিটিশ আমলে তেরশ্রীতে তেরশ্রী এস্টেট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং জমিদার বাড়িটি ও ছিল এই গ্রামে।
প্রতিষ্ঠাতা: স্থানীয় লোকগাথা ও ইতিহাস অনুযায়ী, জমিদার কালী চরণ রায় চৌধুরী এই জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। শুরুতে তিনি কঠোর শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন; কোনো কোনো বিবরণে তাঁকে অত্যাচারী জমিদার হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বর্ণযুগ: কালী চরণের মৃত্যুর পর তার পুত্র অন্যতম বুদ্ধিজীবী সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব নেন। তিনি তাঁর বাবার সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনদরদি, সমাজসেবক, প্রজাহিতৈষী, শিল্প-সাহিত্যানুরাগী ও অসাম্প্রদায়িক। তিনি নিজের জমি ও অর্থ ব্যয় করে তেরশ্রী কালীনারায়ণ ইনস্টিটিউশনের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে অবদান রাখেন।
জানা যায়, তিনি ওই এলাকায় প্রায় ১৩টি মন্দির এবং সমসংখ্যক মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
এছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও অন্যান্য জমিদারদের মতো দেশত্যাগ না করে দেশের মানুষের প্রতি, প্রজাদের প্রতি এবং মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসার টানে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজ দেশেই অবস্থান করেন।
১৯৭১ সালের নির্মম ট্র্যাজেডি
এই জমিদার বাড়ির ইতিহাস সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি ঘটনার কারণে:
তেরশ্রী গণহত্যা: ‘১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর’ শীতের ভোরে প্রায় ৩০০ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সহ স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় পুরো তেরশ্রী গ্রাম ঘিরে ফেলে।
জীবন্ত দগ্ধ: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ ভূমিকা এবং পৃষ্ঠপোষকতার কারণে পাকিস্তানি সেনারা তৎকালীন দেশপ্রেমিক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। সে সময় তিনি প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে ধরে ফেলে। এছাড়াও তার বাড়িতে ঢুকে সব ধংস, লুট ও পুড়িয়ে সব ভস্মীভূত করার মাধ্যমে তাদের পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়।
শহীদদের স্মৃতি: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত একটি এলাকা তেরশ্রী। ১৯৭১ সালে একই দিনে তেরশ্রী স্ট্রিটের জমিদার, তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান সহ ওই এলাকার মোট ৪৩ জন স্বাধীনতাকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা এবং কিছু বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, যা তেরশ্রী ট্রেজেডি নামে পরিচিত। এই শহীদদের স্মরণে পরবর্তীতে তেরশ্রীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

জমিদার পরিবারের মুক্তিযুদ্ধে অবদান
তাঁর একমাত্র ছেলের কাছ থেকে জানা যায়, জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী সব সময় দেশীয় পণ্য ব্যবহার করতেন। বিদেশি, বিশেষত ব্রিটিশ পণ্য, তিনি ব্যবহার করতেন না। এমনকি সে সময় ধূমপান করলেও তিনি কখনো সিগারেট খেতেন না; বরং দেশীয় বিড়ি ব্যবহার করতেন। দেশের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ও স্বদেশি ভাবনারই যেন প্রতিফলন ঘটেছিল তাঁর এই জীবনযাপনে।
সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়ের সঙ্গে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সুসম্পর্ক ছিল। তিনি ওই জমিদার বাড়িতে আসতেন। সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় কোনো প্রথাগত ডিগ্রি অর্জন করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি প্রায় আটটি ভাষায় লিখতে, পড়তে ও কথা বলতে পারতেন।। ৪টি ধর্মের গ্রন্থ (কুরআন, গীতা, বাইবেল ত্রিপিটক) সম্পর্কেও পান্ডিত্ত অর্জন করেছিলেন এবং তৎকালিন সময়ে অত্র এলাকায় তিনি ছিলেন একজন কুরআনের হাফেজ।
‘২২ নভেম্বর’ সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়কে হত্যার পর, ২৩ নভেম্বর তাঁর স্ত্রী ওই পোড়াবাড়িতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি ক্যাম্প স্থাপন করেন, ১২৫ থেকে ১৩০ জনকে আশ্রয় দেন এবং তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। সে হিসেবে তাকে বাংলাদেশ সরকার কতৃক ২০২০-২১ সালে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
বর্তমান অবস্থা

সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর বংশধরেরা বর্তমানে ওই জমিদার বাড়িতে বসবাস করেন। ১৯৭১ সালে হামলার পর বর্তমানে কালের বিবর্তনে এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমিদার বাড়িটি এখন প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। এর চারপাশের দেয়াল ও খিলানগুলো লতাপাতায় ছেয়ে গেছে। বাড়ির ভিতেরে জরাজীর্ণ একটি পূজা মন্ডপ ছাড়া খুব বেশি স্থাপনা খুজে পাওয়া যায় না। তবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে প্রতিবছর কিছু পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী স্থানটি পরিদর্শন করেন।

যাতায়াত ব্যবস্থা
ঢাকা থেকে সড়কপথে মানিকগঞ্জ হয়ে এখানে যাওয়া যায়। এক দিনে তেরশ্রী জমিদার বাড়ি ঘুরে এসে আবার ঢাকায় ফিরে আসাও সম্ভব।
প্রথমে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে মানিকগঞ্জে বা ঘিওরের বাসে উঠুন। বাস হিসেবে আপনি ”সেলফি বা নিলাচল পরিবনের বাস” নির্বাচন করতে পারেন (ভাড়া জনপ্রতি ১৪০ থেকে ১৫০টাকা)। গাবতলী থেকে বাসে উঠে আপনাকে নামতে হবে বরংগাইল বাস স্ট্যান্ডে এবং সেখানে নেমে সিএনজি বা ইজি ইজিবাইকে করে যেতে হবে ঘিওর বাসস্ট্যান্ডে। ঘিওর বাস স্ট্যান্ড থেকে স্থানীয় ইজিরাইক বা অটোরিকশা করে অল্প সময়ের মধ্যেই সরাসরি তেরশ্রী গ্রামে যেতে পারবেন। তেরশ্রী গ্রামে পৌঁছে স্থানীয় কাউকে ‘তেরশ্রী জমিদার বাড়ি’ কোথায়, জিজ্ঞাসা করলে তিনি পথ দেখিয়ে দেবেন।
মানচিত্র
গুগলের মানচিত্রে তেরশ্রী জমিদার বাড়ি, মানিকগঞ্জ।





