নির্মাণকাল: ১৬৭৯–১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ
অবস্থান: কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
স্থাপত্য ধরন: মুঘল স্থাপত্য।

ঢাকার কারওয়ান বাজারের পরিচয় এখন মূলত পাইকারি বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর ব্যস্ত সড়ক ঘিরে। কিন্তু এই এলাকার ইতিহাস কয়েক দশকের নয়। এখানেই রয়েছে মুঘল আমলে নির্মিত আম্বর শাহ (রহ.) শাহি জামে মসজিদ। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে টিকে থাকা এই মসজিদ ঢাকার পুরোনো স্থাপনাগুলোর একটি।

মসজিদটি নির্মাণ করেন mo। তিনি বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানের অধীনে প্রধান খোজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ইতিহাসবিষয়ক লেখায় মসজিদটির নির্মাণকাল ১৬৭৯–১৬৮০ সাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে এর অবস্থান ২২তম বলে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের একটি লেখায় উল্লেখ রয়েছে।
সরাইখানার পথিকদের নামাজের জায়গা

মুঘল আমলে ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগের জন্য সড়ক ও নৌপথ ব্যবহৃত হতো। তখন পথের পাশে সরাইখানা ছিল, যেখানে দূর থেকে আসা যাত্রীরা বিশ্রাম নিতেন। কারওয়ান বাজার এলাকার পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে এমন সরাইখানার সম্পর্ক রয়েছে। ধারণা করা হয়, ওই এলাকার পথিক ও স্থানীয় মানুষের নামাজ আদায়ের জন্য আম্বর শাহ মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

বর্তমান কারওয়ান বাজারের সঙ্গে তখনকার এলাকার চেহারার অনেক পার্থক্য ছিল। এখন যেখানে দোকানপাট, আড়ত ও উঁচু ভবন, সেখানে একসময় জনবসতি ও যাতায়াতের ধরন ছিল ভিন্ন। মসজিদটি সেই সময়ের একটি স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।
তিন গম্বুজ ও কালো পাথরের মেহরাব

আম্বর শাহ শাহি মসজিদ একতলা ও তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কালো পাথরের তৈরি মেহরাব। মুনতাসীর মামুনের লেখায় বলা হয়েছে, মেহরাবের পাথর রাজমহল থেকে আনা হয়েছিল।

মসজিদটি প্রায় ১২ ফুট উঁচু একটি ভিত্তিমঞ্চের ওপর নির্মিত। ভিত্তিমঞ্চের ওপরের অংশে পদ্মের পাপড়ির মতো নকশা রয়েছে। এর চার কোণে আছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। বুরুজগুলোর ওপর ছোট গম্বুজ রয়েছে। পূর্ব দিকের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে খিলানযুক্ত প্রবেশপথে যাওয়া যায়।

মসজিদটির দুটি শিলালিপিও উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্রীয় মেহরাবের ওপরে থাকা শিলালিপিতে কোরআনের একটি আয়াত রয়েছে। অন্যটি কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের বাইরের দিকে, যেখানে নির্মাণসালের উল্লেখ আছে। এসব বৈশিষ্ট্য মসজিদটির নির্মাণকাল ও স্থাপত্য সম্পর্কে তথ্য দেয়।
মসজিদের পাশে খাজা আম্বরের সমাধি
মসজিদের সঙ্গে এর নির্মাতা খাজা আম্বরের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। মসজিদের পাশেই তাঁর সমাধি রয়েছে। শুরুতে সেখানে পাথরের তৈরি কবরফলক দেখা যেত। পরে কবরের ওপর ইট দিয়ে একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।
মসজিদের পূর্ব দিকের সিঁড়ির পাশে একসময় খাজা আম্বরের খনন করা একটি কূপ ছিল। বর্তমানে কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে বলে প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কূপটি আর আগের অবস্থায় না থাকলেও মসজিদের ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
খাজা আম্বরের সঙ্গে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থারও যোগসূত্র ছিল। মুনতাসীর মামুনের লেখায় উল্লেখ আছে, রমনা থেকে মসজিদে যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি ইস্কাটন খালের ওপর একটি পুল নির্মাণ করেছিলেন। গত শতকের ষাটের দশকে রাস্তা প্রশস্ত করার সময় পুলটি ভেঙে ফেলা হয়।
সংস্কার ও বর্তমান অবস্থা
দীর্ঘ সময় ধরে মসজিদটিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে বর্তমান ভবনের সব অংশ যে নির্মাণকালের মতো অবিকৃত রয়েছে, তা বলা যায় না। কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরামর্শে মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করে চুন-সুরকি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছিল বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
পুরোনো মসজিদ ভবনটি প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গার ওপর অবস্থিত। মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এর পাশে নতুন মসজিদ ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে পুরোনো ও নতুন—দুই ভবনেই নামাজ আদায় করা হয়।
কারওয়ান বাজারের আশপাশে নতুন ভবন, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠায় পুরোনো মসজিদটি বাইরে থেকে সহজে চোখে পড়ে না। ব্যস্ত এলাকার মধ্যে থেকেও এর ঐতিহাসিক পরিচয় অনেকের অজানা থেকে যায়।
সংরক্ষণে প্রয়োজন সচেতনতা
আম্বর শাহ শাহি মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি ঢাকার মুঘল আমলের ইতিহাসের একটি বাস্তব নিদর্শন। এর মেহরাব, গম্বুজ, শিলালিপি, ভিত্তিমঞ্চ ও পাশের সমাধি অতীতের স্থাপত্য ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়।
পুরোনো স্থাপনা সংস্কারের সময় এর মূল নকশা ও ঐতিহাসিক উপাদান যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। পাশাপাশি মসজিদটির নির্ভরযোগ্য ইতিহাস, শিলালিপি ও পুরোনো ছবি সংরক্ষণ করা দরকার। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে, বর্তমানের ব্যস্ত কারওয়ান বাজারের ইতিহাস কতটা পুরোনো।
শেষ কথা
১৬৭৯–১৬৮০ সালের দিকে নির্মিত আম্বর শাহ শাহি মসজিদ আজও কারওয়ান বাজারে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে এলাকার চেহারা বদলেছে, বেড়েছে মানুষের ভিড় ও ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু মসজিদটি এখনও ঢাকার অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই স্থাপনাকে টিকিয়ে রাখতে শুধু সংস্কার করলেই হবে না; এর ইতিহাসও সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ, পুরোনো মসজিদটি হারিয়ে গেলে শুধু একটি ভবন নয়, ঢাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও হারিয়ে যাবে।





