কলাকোপা জমিদার বাড়ি, নবাবগঞ্জ

আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব ঢাকা শহরের কাছাকাছি অবস্থিত নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতি নদীর তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা কলাকোপা-বান্দুরা এলাকার সঙ্গে। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাসের নানা নিদর্শন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো কোকিলপেয়ারি জমিদারবাড়ি এবং এর আশপাশে অবস্থিত বেশ প্রাচীন ও বিশালাকার প্রাসাদ সমূহ।

তৎকালীন সময়ে লবণ, তেল, সুপারি ও কাপড়ের ব্যবসা করে যারা বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিলেন, তাঁদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদাররাও এখানে ইউরোপীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মাণ করেছিলেন চোখধাঁধানো সব অট্টালিকা। প্রাচীন এই এলাকাটি পুরনো আমলে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নদীবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

জমিদার পরিবারের ইতিহাস

ঢাকার পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারের বংশধরের একটি বংশ প্রায় দুইশত বছর পূর্ব থেকে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপায় বসবাস করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার জন্য চারদিকে নদী বেষ্টিত এই এলাকায় তারা কয়েকশো বছর আগে থেকে বসবাস শুরু করে। মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারের বংশধর যখন কলাকুপায় বসতি স্থাপন করেন তখন মানিকগঞ্জ থেকে কলাকোপা শুধুমাত্র নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, এছাড়া অন্য কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে।

জানা যায় যে কলকাতা ও লন্ডনের সাথে তাদের বাণিজ্য ছিল, লবণ ব্যবসা-ই ছিল তাদের প্রধান পণ্য। বাবু রাধারমন রায় ও হরেন্দ্র নাথ সাহা এই এলাকায় প্রখ্যাত লবণ ব্যবসায়ী ছিলেন। কলাকুপায় শাহা ও রায় পরিবারের মধ্যে লবণ ব্যবসায় প্রতিযোগিতা ছিল। এই দুই পরিবারের মধ্যে রায় পরিবার স্থানীয় শিক্ষা প্রসারের জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বাবু রাধারমন রায় ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলাকুপায় তার মায়ের নামে কলাকোপায় প্রায় ১০ একর জায়গা একক দানের মাধ্যমে কোকিলপ্যারী উচ্চবিদ্যালয় নামের স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করেন। এরকম প্রবাদ রয়েছে শোনা যায় তাদের মধ্য থেকে তিনটি শরিক যখন বিভক্ত হয়ে যায় তখন তাদের যে সকল সোনা দানা গহনা এগুলো তারা ভাইদের মধ্যে ভাগ করে নেন ধামা দিয়ে, এ থেকেই বোঝা যায় তারা কি পরিমাণ ধন সম্পদ লবণ ব্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন।

কোকিলপ্যারী জমিদার বাড়ি

ইতিহাস

আনুমানিক ১৮০০ শতকে জমিদার ব্রজেন রায় (সুদর্শন রায়) প্রায় ৪ একর জমির ওপর এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন, যা মূলত ‘ব্রজ নিকেতন’ বা  বা কোকিলপ্যারী জমিদার বাড়ি (কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি) নামে পরিচিত। এখানকার জমিদার রাধারমরায় পরবর্তীতে তার মায়ের নামে বাড়িটির নামকরণ করেছিলেন। এটি নিচে উল্লেখিত জজ বাড়ি ও উকিল বাড়ি থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে অবস্থিত আরেকটি সম্পূর্ণ আলাদা পুরোনো ভবন।

বর্তমান অবস্থা

রাধারমন রায় লবণ ব্যবসায়ী হলেও তাদের প্রাচীন বাড়িটিকে স্থানীয় লোকজন রাজবাড়ী হিসেবেই চিনে থাকেন। দুইশত বছর আগের এই রাজবাড়ীটি প্রায় এখনো সম্পূর্ণ অটুট ও অক্ষত রয়েছে। রাধারমন রায়রা তিন ভাই ছিলেন, তারা সংসারের জন্য আলাদা হয়ে মূল ভবনের নিকটেই আরো দুটি অট্টালিকা নির্মাণ করেন, বর্তমানে এই দুটি ভবনের একটি উকিলবাড়ী এবং আরেকটি জজবাড়ী নামে পরিচিত। বর্তমানে মূল ভবনটি বর্তমানে কলাকোপা কোকিলপ্যারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসন বা কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ধনী ব্যবসায়ীদের বাড়ি

জজ বাড়ি

এটি জমিদার ব্রজেন রায় ওরফে সুদর্শন রায়ের তৈরি করা মূল রাজকীয় প্রাসাদ, পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে একজন বিচারপতি (জজ) এই বাড়িটি ক্রয় করায় স্থানীয়ভাবে এটি জজবাড়ি নামে পরিচিতি পায়। এটি আকর্ষণিয় হলেও সাধারন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়।

উকিল বাড়ি (ব্রজ কুটির)

জজবাড়ির ও কোকিলপ্যারী জমিদার বাড়ির ঠিক মাঝেই আরেকটি আকর্ষণিয় ও ভিন্ন জমিদার বাড়ি রয়েছে। পরবর্তীতে একজন আইনজীবী (উকিল) সেটি কিনে নেওয়ার পর থেকে সেটিকে স্থানীয়রা উকিল বাড়ি নামে ডাকেন।

আনন্দকুটির

এছাড়াও উকিল বাড়ীর ঠিক অপজিটদিকে রয়েছে প্রায় ১৫০ পুরোনো আনন্দকুটির, যা বর্তমানে লিজ নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। লোহার পাত ও টালি আকৃতির ইট দ্বারা নির্মিত ছাদ, প্রসস্থ সিঁড়ি ও বারান্দায় লোহার পিলার সহ নান্দনিক স্থাপত্তের চিন্হ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভবনটি।

অন্যান্য বাড়ি

এছাড়া এখানে রয়েছে রাধানাথ সাহার বাড়ি, পোদ্দার বাড়ি, দাস বাড়ি এবং পাইন্না বাড়ি। এগুলো মূলত সে আমলের সোনা, লোহা বা অন্যান্য ব্যবসা করে ধনী হওয়া ব্যক্তিদের তৈরি করা বিলাসবহুল ভবন।

আনসার ব্যাটালিয়ন সদর দফতর

কলাকোপার বেশ কিছু প্রাচীন প্রাচীন ভবন ও বিশাল অট্টালিকা বর্তমানে ১৭ আনসার ব্যাটালিয়ন সদর দফতর (ক্যাম্প) হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে. রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ এলাকা হওয়ায় এখানে সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত নিষিদ্ধ এবং বিশেষ অনুমতি ছাড়া সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি নেই।

পর্যটন সম্ভাবনা

নবাবগঞ্জের কলাকোপার এই প্রাচীন অট্টালিকাগুলো দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটে থাকে। কখনো কখনো বিদেশি পর্যটকদের আগমনও ঘটে। স্থানীয়রা মনে করেন রাজবাড়ী গুলো সংস্কার করলে দেশ ও বিদেশী পর্যটক আরও বৃদ্ধি পাবে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার গুলিস্তান বাস টার্মিনাল থেকে প্রতি আধা ঘন্টা পর পর ছেড়ে যায় মইনোর ঘাটের বাস এই রুটের যেকোনো বাসে উঠেই খুব সহজেই যাওয়া যায় কলাকুপা এলাকায়। গুলিস্তান থেকে কলাকুপা রুটের জনপ্রতি ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বাসে করে না গিয়েও আপনারা প্রাইভেটকার বা সিএনজি করেও খুব সহজেই ঘুরে আসতে পারবেন কলাকোপা থেকে। বাসে করে গেলে ঢাকার গুলিস্তান থেকে কলাকোপা যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘন্টা।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলতে গেলে, কলাকোপা কোনো একক রাজবাড়ী বা জমিদারবাড়ি নয়; বরং এটি ছিল উনিশ শতকের বাংলার ধনাঢ্য হিন্দু জমিদার ও প্রভাবশালী বণিকদের গড়ে তোলা একটি সমৃদ্ধ আবাসিক এলাকা বা নগরী। তাঁদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও তৎকালীন সামাজিক-অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিফলন আজও এখানকার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা রাজকীয় প্রাসাদোপম অট্টালিকাগুলোতে দৃশ্যমান। দেশভাগের পর এসব বাড়ির অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও, তাঁদের রেখে যাওয়া স্থাপত্য ও ঐতিহ্য আজও কলাকোপাকে উনিশ শতকের বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে তুলে ধরে।

উক্ত আর্টিকেলে অথবা ওয়েবসাইটের কোথাও ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানান, যাতে আমরা দ্রুত সংশোধন করতে পারি।
মোঃ আতিকুর রহমান আতিক
আতিকুর রহমান

মোঃ আতিকুর রহমান আতিক — VromonKori.com-এর লেখক ও অ্যাডমিন। তিনি ভ্রমণ গন্তব্য, ভ্রমণ গাইড, টিপস ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তথ্যভিত্তিক লেখা প্রকাশ করেন।

Articles: 100

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *