ঢাকার টিকাটুলি এলাকার কে এম দাস রোডে অবস্থিত রোজ গার্ডেন প্যালেস (Rose Garden Palace) রাজধানীর অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা যা সংক্ষেপে রোজ গার্ডেন নামে পরিচিত। ১৯৩১ সালে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ঋষিকেশ দাস বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের টিকাটুলি এলাকায় প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর এই দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইতিহাস
প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, পাশের জমিদার নারায়ণ চন্দ্র চৌধুরীর বলধা গার্ডেনে আমন্ত্রিত হয়ে একটি জলসায় গিয়ে অপমানিত হওয়ার পর নিজের সামর্থ্য ও রুচির পরিচয় দিতে তিনি এই জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাসাদের সামনে বিশাল গোলাপবাগান থাকায় এটি পরবর্তীতে ‘রোজ গার্ডেন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রাসাদ নির্মাণ ও এর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করায় একপর্যায়ে ঋষিকেশ দাস আর্থিক সংকটে পড়েন। নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯৩৭ সালে তিনি রোজ গার্ডেন প্যালেসটি খান বাহাদুর মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের কাছে বিক্রি করে দেন। কাজী আবদুর রশীদ পরে নিজের নাম অনুসারে এর নাম ‘রশীদ মঞ্জিল’ রাখেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মেজ ছেলে কাজী আবদুর রাকিব এর উত্তরাধিকারী হন। এরপর বহু বছর ধরে তাঁর পরিবারের সদস্যরা সম্পত্তিটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে Bengal Studio and Motion Pictures Limited রোজ গার্ডেন প্যালেস ইজারা নেয়। পরবর্তীতে এখানে অনেক নাটক, সিনেমা এবং বিজ্ঞাপনের শুটিং করা হয়। ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। তবে আদালতের রায়ে ১৯৯৩ সালে মালিকানা ফিরে পান খান বাহাদুর মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের মেজ ছেলে কাজী আবদুর রাকিব।
মালিকানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রাসাদটি টিকে থাকলেও এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ক্রমেই আরও বাড়তে থাকে। সংগীত, নৃত্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের কারণে একসময় এটি ঢাকার অভিজাত সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র ছিল।

স্থাপত্য শৈলী ও নন্দনতত্ত্ব
দুই তলা এই প্রাসাদের আয়তন প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট। ৬টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটিতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন লতাপাতার কারুকাজ। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে বড় কামরা ও নাচঘর, আর নিচতলায় রয়েছে আটটি কক্ষ। সামনের পুকুরটি প্রাসাদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। এছাড়া পুরোনো স্থাপত্য ও রাজকীয় সাজসজ্জার কারণে রোজ গার্ডেন প্যালেস আজও ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা।

রোজ গার্ডেনের স্থাপত্যে ইউরোপীয় শৈলীর সুস্পষ্ট প্রভাব ফুটে ওঠে। উঁচু খিলান, মার্বেল পাথর, অলঙ্কৃত জানালা-দরজা, বলরুম ও ফোয়ারা যুক্ত বাগান ছিল এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রাসাদ ঘিরে ছিল বিশাল গোলাপ বাগান, যা থেকে নামের উৎপত্তি—‘রোজ গার্ডেন’।

স্থাপত্যের নান্দনিকতা ও বাহারি সজ্জা তৎকালীন সমাজের রুচি, ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির প্রমাণ বহন করে। আজও যারা এটি পরিদর্শনে যান, তারা সময়ের স্রোত পেরিয়ে এক ভিন্ন যুগের অনুভব করেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
রোজ গার্ডেন প্যালেসের গুরুত্ব শুধু স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এই প্রাসাদে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত হয়। ফলে রোজ গার্ডেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমান অবস্থা
সবশেষে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩৩১ কোটি টাকায় এই ঐতিহাসিক প্রাসাদটি ক্রয় করে। এরপর ভবনটি সংরক্ষণ ও জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন প্যালেস ভবনটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষিত রয়েছে। এটি দর্শনার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত। পুরান ঢাকার পুরোনো স্থাপত্য, বাগানবাড়ি ও প্রাসাদগুলোর মধ্যে রোজ গার্ডেন প্যালেস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নির্মিত একটি জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ কীভাবে সময়ের পরিক্রমায় ঢাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে—রোজ গার্ডেন প্যালেস তারই এক অনন্য উদাহরণ।
উপসংহার
রোজ গার্ডেন প্যালেস কেবল একটি স্থাপত্য নিদর্শন নয়—এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অমূল্য দলিল। একসময় যেখানে সংগীত, নৃত্য ও ভোজসভার আয়োজন হতো, পরে তা পরিণত হয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রস্থলে। আজও এটি অতীতের ঐশ্বর্য ও মর্যাদার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সম্পদ ভবিষ্যতের পথচলায় আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে—ঢাকার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করবে।
টিকিট এবং সময়সূচি
প্রবেশ ফি
রোজ গার্ডেন প্যালেসের টিকেট ফি নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| দর্শনার্থীর ধরন | প্রবেশ ফি | শর্ত |
|---|---|---|
| সাধারণ দর্শনার্থী | ৩০ টাকা | — |
| শিক্ষার্থী | ১০ টাকা | (৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত, অবশ্যই স্কুল/কলেজ ড্রেস/আইডি কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে) |
| শিশু (১০ বছরের কম) | বিনামূল্যে | টিকিট লাগবে না |
| সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক | ২০০ টাকা | — |
| অন্যান্য বিদেশি পর্যটক | ৪০০ টাকা | — |
সময় সূচি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সাপ্তাহিক বন্ধ | রবিবার |
| সোমবার | দুপুর ২:০০টার পর |
| গ্রীষ্মকালীন | ১ এপ্রিল – ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ৯:০০টা থেকে বিকাল ৫:০০টা পর্যন্ত |
| শীতকালীন | ১ অক্টোবর – ৩১ মার্চ সকাল ১০:০০টা থেকে বিকাল ৬:০০টা পর্যন্ত |
মানচিত্র
গুগলের মানচিত্রে বাংলাদেশ রোজ গার্ডেন প্যালেস, টিকাটুলি, ঢাকা।




